বদলে যাওয়ার পথে- জাহাঙ্গীর আলম শোভন

2016-05-01-1462073480-1373723-failuresuccess
0

মানুষের সমাজব্যবস্থাটা পরিবর্তনশীল। মানুষের মানবিক কিছু বৈশিষ্ট্য, ধর্ম, পার্থিব কিছু নিয়মের বাইরে সমাজ, অর্থ, রাষ্ট্র ও বাজার ব্যবস্থা ক্রমাগতই বদলে যাচ্ছে। এই বদলে যাওয়ার মূলে থাকে কিছু ঘটনা, কিছু ব্যক্তি অথবা কিছু আবিষ্কার। আমরা মানি কিংবা না মানি, জানি কিংবা না জানি পরিবর্তন চলছেই। আমরা বেশীরভাগ মানুষ কিন্তু পরিবর্তন করতে পারি না, আমরা নিজেরা পরিবর্তনের উপাদান হয়ে যাই কিংবা পরিবর্তিত হয়ে যাই। শুধু রাস্ট্রনায়ক, চিন্তানায়ক কিংবা দার্শনিকরা যে বিশ্বকে বদলে দিয়েছে তা নয়। আধুনিক বিশ্বে পরিবর্তনের ভূমিকা রাখছে মিডিয়া। সবচেয়ে মজার ব্যাপার সবচেয়ে বেশী ভূমিকা কয়েকটি বাজারি প্রতিষ্ঠানের। যেসব প্রতিষ্ঠান লাভের জন্য বাজারে নতুন নতুন পন্য বা ধারণা বিক্রি করে। বলা বাহুল্য এসব কোম্পানীর পেছনে থাকে এক বা একাধিক মনুষ্যজীব।
ভেবে দেখুন বিগত কয়েক দশক ধরে সারাবিশ্বের মানুষের জীবনযাত্রা, অভ্যাস এমনকি পছন্দ অপছন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে স্টিভ জবস এবং বিল গেটস এর মতো মানুষেরা। আপনি কিংবা আমি আমরাওতো তাদের মত মানুষ। আসুন আমরা সিদ্ধান্ত নিই। এই পরিবর্তনের সোপানে আমাদের ভূমিকা কি হবে?

দৃষ্টিভঙ্গি বদলান-জীবন বদলে যাবে

খুব বহুল প্রচলিত একটি স্লোগান। চরম সত্যও বটে। আমার যে ধারণার জন্য আমি অন্যের ভালো কাজকে ছোট করে দেখছি, অন্যের অর্জনকে বাঁকা চোখে দেখছি। যেজন্য আমি বেশীরভাগ মানুষের সাথে মিশতে পারছিনা কিংবা যেজন্য আমি সমাজের প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অনেক কিছুর জন্য কঠিন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছি। সে বিষয়গুলোতে আমিতো আরো একবার ভাবতে পারি। যে আমি যা বুঝি তাকি সত্য অথবা সেটা সত্য থেকে কতটুকু দুরে? এই ভাবনা হয়তো আমাকে অনেক কাজে সহজ করে দেবে।

যেমন, কেউ ধারণা করলো পুলিশ মানেই খারাপ। কিন্তু পুলিশতো সমাজের বাসিন্দা। সমাজ ব্যবস্থা যদি সঠিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে সমাজে কোনো একটা পেশা খারাপ হবে কেন? তখন তার সামনে সামজের অন্যান্য দিক ফুটে উঠবে। এবং নির্দিষ্ট কোনো পেশাকে আলাদাভাবে খারাপ মনে হবে না।

হয়তো বদলে যাও নয়তো বদলে দাও

পবিরর্তনের ধারা কিন্তু মোটেও আরামদায়ক নয়। সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থার উপর কিছু সুবিধাভোগী শ্রেনী তেরী হয়। তারা সবসময় পরিবর্তনের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তখন তারা বাপ দাদার দোহাই দিয়ে পুরনোকে আটকে ধরতে চায়। আমাকে পরিবর্তনের সাথে ইতিবাচকভাবে খাপ খেতে হবে। পরিবর্তন থেকে যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করতে হবে। যা কিছু অগ্রহনযোগ্য তা বাদ দিতে হবে। ভালোকে গ্রহণ করার জন্য প্রয়োজনে নিজেকে বদলে নিয়ে খাপ খেতে হবে অথবা কখনো নিজেকে নেতৃত্বে নিয়ে যেতে হবে এবং নিজের চারপাশকে বদলে দেয়ার জন্য কাজ করতে হবে। জীবনটা যেন এমন না হয় ‘‘আইলাম আর গেলাম, পাইলাম আর খাইলাম, ভবে দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না’’

চামাচামি নয় বুক চিতিয়ে সত্য বলতে হবে

একটা বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করবো। আমরা বাসে, ট্রেনে, চা দোকানে, অফিসে আড্ডায় বাংলাদেশের রাজনীতির সমালোচনা করি। কখনো কখনো গালি গালাজ করে চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করি। আমরা যে এই কাজটা করি, এর মধ্যে কয়জন মানুষ রয়েছেন যারা তাদের প্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীর সামনে, অফিসে বা সভায় গিয়ে তাদের সমালোচনা করতে পারি বা ভুল ধরতে পারি। আমরাতো মনে হয়- বাংলাদেশের মতো এরকম আর কোথাও নেই। এদেশের মানুষ নিজ দলের নেতা নেত্রীর অন্যায় কথা কাজ এমন কি খুন খারাপি লুটতরাজ দূর্নিতি সরাসরি এবং পরোক্ষ দুইভাবেই সমর্থন করে। এখন ভাবুন আপনাকে যদি হাজার হাজার মানুষ ভালো-মন্দ সবকাজে সমর্থন করতো আপনি কি করতেন?
শুধু সমালোচনা নয়, চাই প্রশংসা ও পরামর্শ
আমাদের চারপাশে আমরা সারাদিন যতগুলো সমালোচনা শুনি তার চেয়ে কয়টা শুনি প্রশংসা কিংবা পরামর্শ। আমি স্বীকার করছি আমাদের যত সমস্যা এবং প্রতিদিন আমরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হই। তাতে প্রশংসা করার মতো ঘটনা খুব কমই ঘটে। তবুও প্রশংসা করতে হবে ছোট একটা কাজের- যাতে করে বড়ো কাজ করার জন্য উৎসাহ তৈরী হয়। আমি মনে করি যে সমালোচক শুধু সমালোচনা করে সে পরশ্রীকাতর বা পরনিন্দাকারী। প্রকৃত সমালোচক কিছু প্রশংসাও করবে এবং অবশ্যই কিছু পরামর্শ বা দিক নির্দেশনা দেবে।

একপক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকুন
বেশীর ভাগ লোককে দেখেছি কোনো এক লোকের কথা শুনে অন্য লোক সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষন করেন। এমনকি কখনো কখনো দেখা যায় কিছু লোকের কথা শুনে বহুলোক বিভ্রান্ত হয় গ্রাম শহরে সংঘর্ষ পর্যন্ত বেঁধে যায়। পত্রপত্রিকায় কখনো কখনো দেখা যায় পুলিশ একজনের কথায় আরেকজনকে ধরে নিয়ে গেল এমনকি নির্যাতন করলো কখনো কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। আমি জানি না বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও মানুষদের মাঝে এই প্রবণতা আছে কিনা আর থাকলেও সেটা এই পরিমাণ কিনা? এই ধরনের প্রবণতা দূর করতে হবে। এটা থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে আগামীদিনের বাংলাদেশ ‍সামনের সারিতে আসতে পারবেনা।

নৈতিকতার মানদন্ড
খুন, ব্যবিচার, চুরি, ডাকাতি, লুট এসব পাপ বা অন্যায় এটা মোটামোটি আমাদের দেশের লোকেরা বোঝেন। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাপারে মনে হয় আমাদের নৈতিকতায় সমস্যা আছে। যেমন কিছু লোক মনে করে চোর চুরি করেছে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়। ফলে প্রায় সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এমনকি কখনো কখনো চোর ডাকাত সন্দেহে ভালোমানুষকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। সাভারের আমিনবাজারের ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। এ ধরনের প্রবণতা মানতার পরিপন্থি।
আবার অনেকে মনে করেন, অফিস একজনের ফাইল পাস হওয়ার জন্য সহযোগিতা করলাম। বিনিময়ে কিছু নিলাম এটা ঘুষ নয়। বিশ্বাস করুন বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর সব দেশে এটাকে দূর্নীতি বলে। সরকারী অফিসে জনগনের কাজ করার জন্যই কর্মচারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
আমরা কিছু লোক মনে করি ঘুষ দিয়ে চাকরী করা বড়ো কোনো দোষ নয়। আমিতো কারো ক্ষতি করছিনা। এটাও ভুল ধারণা আইনের দৃষ্টিতে দুজনই অপরাধি। সূতরাং দিন বদলের সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে এই দৃষ্টিভঙ্গিগুলো বদলাতে হবে।

অন্যদের দিয়ে বিচার
আমরা বেশীরভাগ সময় আমাদের শিক্ষা, আদর্শ ও বিবেক দিয়ে কোনো বিষয়কে বিচার করিনা। বিচার করি অন্যদের দিয়ে। মনে করি অমুক নেতা যদি নেতা হয়ে মানুষ খুনের আদেশ দিতে পারে তাহলে আমিতো ছোটখাটো দোষ করতেই পারি। বড়ো বড়ো লোকেরা যেখানে কোটি টাকা লোপাট করছে সেখানে আমি অল্প কিছু খেলে দোষ কোথায়? এসব ধারণা পৃথিবীর কোথাও চলেনা, অনেক মনস্তত্ববিধ মনে করেন এ ধরনের ধারণা পোষন করা একটা মানসিক ব্যাধি। এ ধরনের ধারণায় যে অপরাধপ্রবনতা তৈরী হয় তাতে করে আস্তে আস্তে বড়ো অপরাধের দিকে মানুষ ধাবিত হতে থাকে। আপনার ভেতরে যদি বড়ো কোনো মানুষ হওয়ার ক্ষমতা বা সম্ভাবনা থাকে এই মানসিকতা সে বড়ো মানুষটিকে চিরদিনের জন্য হত্যা করে দেয়। কারণ সমাজ যেমন আপনাকে বড়ো মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেনা আপনার অপরাধ তালিকার কারণে তেমনি আপনার মনের ভেতর একটা খচখচ থাকবে যে আমিতো এই পাপটা করেছি আমি মনে হয় সেরকম বড়ো কিছু হওয়ার যোগ্য নয়। তাই এই ধারণা যদি থাকে তাহলে আজি বদলে নিন।

যার সাথে যেমন
অনেকে মনে করেন ‘‘আমি মানুষটা আসলে তেমন খারাপ না তবে আমার সাথে কেউ খারাপি করলে তাকে আমি ছাড়িনা। যে খারাপ তার সাথে আমিও খারাপ’’। এই নীতি হয়তো সাময়িক ফল এনে দেয় কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে সমস্যা ডেকে আনে। কারণ যিনি প্রথম অন্যায় করেছে তিনি পরে তার সাথে করা অন্যায়টা তার অন্যায়ের ফল বলে মেনে নেয়না। তিনি আবার পাল্টা প্রতিশোধের কথা ভাবেন। ফলে প্রতিহিংসা চলতেই থাকে। এছাড়া যিনি এমনিতে ভালো মানুষ তিনি যখন প্রতিঘটনা ঘটান তখন তার মধ্যে সে ধরনের ঘটনা ঘটনোর প্রবৃত্তি ও প্রবণতা এসে যায়। কখনো কখনো তিনি সে অপরাধের সাথে জড়িয়ে যান। তাই এটা সমাধান হতে পারে না।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় আমাকে কেউ মারবে আর আমি দাতা হাতেম তাইয়ের মতো বুক চিতিয়ে মার খাবো, এটা কেমন কথা? ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। প্রথমত আত্মরক্ষার চেষ্টা অবশ্যই করতে হবে। দ্বিতীয়ত অপরপক্ষের সাথে সমযোতায় বসতে হবে এতে গোয়ার্তুমি এবং ইগোর কথা ভাবলে চলবেনা। প্রয়োজনে ক্ষমা করতে হবে। অন্য সময়ে গিয়ে তাকে বোঝাতে হবে। সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে, তার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে হবে এবং প্রয়োজনে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। যদি এগুলোর কোনাটাই সম্ভব না হয়। আইনের দ্বারস্থ হতে হবে। নিজেকে নিরাপদ করতে হবে। তার থেকে দূরে থাকতে হবে। আপনি ভেবে দেখুন যাদের আমরা ভালো মানুষ বলে তাদের গুনগান গাই তারা কিন্তু যে যেমন তার সাথে তেমন আচরন করতে বলেন নি।

Share this to your friend

Leave us a comment