কল সেন্টার এর কিছু কথা !!

call-center-jobs
0

বিশাল হলরুমের মতো অফিসরুম। সারি সারি ওয়ার্কটপ। কর্মীরা কাজ করছেন গভীর মনোযোগে। তাদের কানে হেডফোন, হাতের আঙুলগুলো সঞ্চালিত হচ্ছে কম্পিউটারের কিবোর্ড বা মাউস নিয়ে। দৃষ্টি মনিটরের দিকে। এটি একটি কল সেন্টারের দৈনন্দিন চিত্র। অর্থনৈতিক খাতে সা¤প্রতিক সময়ের আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে কল সেন্টার অন্যতম। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মোক্ষম হাতিয়ার এটি। পত্রপত্রিকায় কল সেন্টার নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও অনেকের কাছে কল সেন্টার বিজনেসের ধারণা স্পষ্ট নয়। আসুন এ সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

কল সেন্টার কী ?

কল সেন্টার একটি প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তার হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট করে এবং কাস্টমারদের সেবা দেয়। উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, বাংলাদেশের মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোরও রয়েছে কল সেন্টার, যেমন : গ্রামীণফোনের কাস্টমার ১২১ নাম্বারে কল করলে তাৎক্ষণিক যিনি কল রিসিভ করেন, তিনি সমস্যা শুনে সেবা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে গ্রামীণফোনের এ কল সেন্টারটি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানও পরিচালনা করতে পারতো, সেক্ষেত্রে কল সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটিকে আমরা বলতাম কল সেন্টার। আমরা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি বা ব্যাংকগুলোর সার্ভিস সম্পর্কে ভাবতে পারি। গ্রাহকরা ফোন করলে ইন্স্যুরেন্স অথবা ব্যাংক কোম্পানিগুলো তাদের কল সেন্টারের মাধ্যমে গ্রাহকদের একাউন্ট সম্পর্কিত তথ্য দিতে পারে।

কল সেন্টারের প্রকারভেদ

কল সেন্টার মূলত দুই প্রকার। ইনকামিং বা ইনবাউন্ড কল সেন্টার এবং আউটগোয়িং বা আউটবাউন্ড কল সেন্টার। কোনো ক্লায়েন্ট যখন কোম্পানির কাস্টমার সাপোর্ট বা ইনফরমেশনের জন্য ফোন করেন, তখন সেটা ইনকামিং কল সেন্টার। আউটবাউন্ড কল সেন্টারগুলো সাধারণত মার্কেটিং রিলেটেড হিসেবে কাজ করে। হোম সার্ভিস দেয়। সম্ভাব্য ক্রেতাদের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে, ফোন করে প্রডাক্টের গুণাবলী তুলে ধরে, ক্রেতা রাজি হলে তার বাসায় পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক ছিল আউটবাউন্ড কল সেন্টার হিসেবে যাত্রা শুরু করে দক্ষতা অর্জন করা। পরে আউটবাউন্ড কল সেন্টার হিসেবে অভিষিক্ত হওয়া।

বাংলাদেশ কীভাবে কল সেন্টারের ব্যবসা করতে পারে

উন্নত বিশ্বের দেশগুলো তাদের গ্রাহকদের সেবা দেয়ার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর কল সেন্টার ব্যবহার করছে। যেমন আমেরিকার একটি ব্যাংক বা বীমা কোম্পানি তাদের সেবা দেয়ার জন্য বাংলাদেশের কল সেন্টার ব্যবহার করতে পারে। ভারত এবং ফিনল্যান্ড এ ধরনের কল সেন্টারের বিজনেস করছে। আমেরিকার একজন গ্রাহক যখন ব্যাংকে ফোন করবে, ফোনটি বাংলাদেশের কল সেন্টারে চলে আসবে অত্যাধুনিক দ্রুতগতির ইন্টারেনেটের মাধ্যমে। ব্যাংকের সার্ভারের তথ্যগুলো আমেরিকাতেই থাকবে, দ্রুতগতির ইন্টারনেটের মাধ্যমে কল গ্রহণকারী নিমেষেই ঢুকে পড়বেন সার্ভারে, সেখান থেকে তথ্য জেনে নিয়ে সেবা দেবেন গ্রাহককে অথবা সমস্যা জেনে নিয়ে সার্ভারে এন্ট্রি করে রাখবেন, দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেবেন এবং ব্যবস্থা নেবেন।

কল সেন্টারের ব্যবসা করতে হলে কী কী প্রয়োজন

লাইসেন্স : যাদের নিজস্ব হিউম্যান রিসোর্স, নির্দিষ্ট ক্লায়েন্ট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সংযোগ থাকবে তাদের জন্য কল সেন্টার লাইসেন্স দেয়া হবে। যন্ত্রপাতি ও সংযোগ না থাকলে হোস্টেড কল সেন্টার হিসেবে লাইসেন্স দেয়া হবে। যন্ত্রপাতি ও সংযোগ আছে কিন্তু জনবল ও ক্লায়েন্ট নেই, তাদের হোস্টেড কল সেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডর হিসেবে লাইসেন্স দেয়া হবে। লাইসেন্সের মেয়াদ ৫ বছর। রেভিনিউ শেয়ারিং হলিডের মেয়াদ ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত কল সেন্টারের জন্য ৩ বছর ও দেশের অন্যান্য এলাকার জন্য ৫ বছর।

রেভিনিউ শেয়ার হলিডের মেয়াদ শেষে কোম্পানিগুলো ০.৫ ভাগ রাজস্ব দেবে বিটিআরসিকে। কল সেন্টারের লাইসেন্স ফি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা, কিন্তু বিজনেস করার জন্য আপনার একটি ট্রেড লাইসেন্সেরও প্রয়োজন পড়বে।

যারা হোস্টেড কল সেন্টার সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে লাইসেন্স নেবেন, তাদের জন্য ৪০% পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু, যারা কল সেন্টার বা হোস্টেড কল সেন্টার হিসেবে লাইসেন্স নেবেন তাদের ক্ষেত্রে ২৫% পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে কল সেন্টার স্থাপনে প্রযুক্তিগত কারণে বিদেশি জনবল দরকার হলে তা সর্বোচ্চ ১০% পর্যন্ত হতে পারবে।

call-center

হিউম্যান রিসোর্স : কল সেন্টার স্থাপন করতে হলে আপনার দক্ষ জনবল থাকতে হবে। দক্ষ জনবল ছাড়া কল সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা বৃথা। কল সেন্টারের বিজনেস কোনো স্মল বিজনেস নয়। ব্যাপক বিনিয়োগের সঙ্গে পর্যাপ্ত হিউম্যান রিসোর্সের জোগান রাখতে হবে। কল সেন্টারের কর্মীদের ভালো ইংরেজি জানতে হবে ও ইংরেজিতে কথা বলতে পারার দক্ষতা থাকতে হবে। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজিতে তার লিসেনিং, স্পিকিং, রিডিং, রাইটিং সব ফিল্ডেই ভালো দখল থাকতে হবে। বাংলাদেশে স্থাপিত কল সেন্টারগুলো কাজ করবে ইংরেজি ভাষাভাষি দেশের হয়ে। প্রয়োজন অনুসারে যে দেশের যে অঞ্চলের ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথোপকথন হবে সেই অঞ্চলের আঞ্চলিক উচ্চারণরীতি জানলে ক্যারিয়ারের জন্য তা পজিটিভ হবে।

অবকাঠামো : প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে কল সেন্টারের ব্যবসা পরিচালনার জন্য। দুর্বল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কল সেন্টারের বিজনেসের জন্য প্রধান অন্তরায়। কল সেন্টার মূলত ক্লায়েন্টনির্ভর সার্ভিস হওয়ায়, ক্লায়েন্টদের সার্ভিস সার্বক্ষণিক নিশ্চিত করতে হলে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো দৃঢ় করতে হবে।

জনবল নিশ্চিত করা

প্রসঙ্গ হিউম্যান রিসোর্স। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের সেই মানের হিউম্যান রিসোর্স নেই। কল সেন্টারে যারা কাজ করবে তাদের ইংরেজি জানতে হবে অসাধারণ, কম্পিউটারেও ভালো মানের দক্ষতা থাকতে হবে। বাংলাদেশের শিক্ষিত বেকারদের সঠিক মানে প্রশিক্ষিত করতে হবে। যারা কল সেন্টারের বিজনেস করতে চান, তারা তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে পারেন। ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে কল সেন্টারে যারা কাজ করে তারা দীর্ঘসময় ধরে কন্টিনিউ করে না। ফলে কল সেন্টার ব্যবসা পরিচালনাকারীরা সমস্যায় পড়ে যান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিয়োগের আগে প্রশিক্ষণসহ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান হিউম্যান রিসোর্সের সঙ্গে চাকরির মেয়াদকালের একটা চুক্তি করতে পারে। যা র‌্যাপিডলি হিউম্যান রিসোর্স খোঁজার সমস্যা থেকে উদ্যোক্তাকে রেহাই দিতে পারে।

প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান

ইদানীং প্রায়ই সাবমেরিন কেবল কাটা পড়ছে। বাংলাদেশের বাইরে সমুদ্রের তলে কাটা পড়ছে প্রায়ই। উপরন্তু আছে দেশের ভেতরে নাশকতামূলক অপটিক্যাল ফাইবার কেবল কাটার প্রবণতা। সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে বাংলাদেশ ক্লায়েন্ট হারাবে। যেহেতু বিজনেস উন্নত দেশের সঙ্গে, ব্যবসায় ক্ষেত্রে উন্নত দেশের মতো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে ব্যবসায় সফলতা আসবে না।

বাংলাদেশে কল সেন্টারের সম্ভাবনা

অমিত সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের গার্মেন্ট সেক্টরে আমরা আমাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছি। এখন সময় এসেছে কল সেন্টারের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার। দেশকে উন্নতির স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দিতে হলে কল সেন্টারের ব্যবসাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে এবং এই চ্যালেঞ্জে সফল হতেই হবে। বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঞ্জুরুল আলম (অব:.) এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সারাবিশ্বে ২০০৯ সাল নাগাদ কল সেন্টার ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৪০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। প্রাথমিক অবস্থায় বাংলাদেশ যদি এর এক শতাংশ বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় তবে প্রতি বছর বাংলাদেশে শুধু কল সেন্টারের মাধ্যমেই অন্তত ছয় বিলিয়ন ইউএস ডলার আয় করা সম্ভব যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান রিজার্ভের চেয়েও বেশি পরিমাণ টাকা আয় করা সম্ভব হবে।

কল সেন্টারের বিজনেসে সফল হওয়ার

কি পয়েন্ট
আমেরিকা বা বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে আমাদের সময়ের পার্থক্য আমাদের জন্য পজিটিভ হতে পারে। কল সেন্টারগুলো যেহেতু দিনরাত সার্ভিস দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে যখন দিন বিশ্বের অনেক দেশেই তখন রাত। ফলে আমাদের জন্য সার্বক্ষণিক ম্যান পাওয়ার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে ম্যান পাওয়ারের সহজলভ্যতা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখনো বাংলাদেশে সবকিছু সস্তা। জনবলও তুলনামূলক সস্তা। উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান খুব সস্তায় হিউম্যান রিসোর্স পেতে পারে। একটু সতর্ক হলে আর সঠিক পলিসি গ্রহণ করলে কোম্পানিতে হিউম্যান রিসোর্সের স্থিতিশীলতা থাকতে পারে, যা দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।

হিউম্যান রিসোর্সের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। যেহেতু বাংলাদেশের জন্য ফিল্ডটা নতুন। কল সেন্টারগুলোকে নিজ উদ্যোগে হিউম্যান রিসোর্সের ডেভেলপমেন্টের জন্য কাজ করতে হবে। কোম্পানির জন্য ভালো হবে, প্রতিটি হিউম্যান রিসোর্সের সঙ্গে ইনডিভিজুয়ালি চুক্তি করা।

সম্ভাবনার দোলাচলে দুলেছি অনেকদিন। শুনেছি ডাটা এন্ট্রির সম্ভাবনার কথা, তারপর শুনেছি মেডিক্যাল ট্রানস্ক্রিপটের সম্ভাবনার কথা, সেই সম্ভাবনাও শেষ হয়ে গেছে। সম্ভাবনার কথা শুনিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছে বিদেশি প্রশিক্ষক কোম্পানি আর তাদের এদেশীয় দোসর। ইতিমধ্যে কল সেন্টারের প্রশিক্ষণ-সেমিনারের নামে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে নিঃস্ব করার অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। সরকারের উচিত হবে কল সেন্টারের প্রশিক্ষণের নামে প্রতারণা রোধে কার্যকর পলিসি তৈরি ও বাস্তবায়ন। দেশের উন্নতির জন্য তরুণ প্রজন্ম কল সেন্টারকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে সফল হলেই সার্থক হবে কল সেন্টার নামের নতুন ক্রেজ। 

Share this to your friend

Leave us a comment